বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে লেনদেনের জন্য বিকাশ একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোকানের বিল দেওয়া থেকে শুরু করে মোবাইল রিচার্জ বা জরুরি প্রয়োজনে টাকা পাঠানো—সবখানেই বিকাশ। অনেকে ভাবেন বিকাশ একাউন্ট খোলা অনেক ঝামেলার কাজ, কিন্তু আসলে এখন এটি পানির মতো সহজ।
আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা জানবো বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম সম্পর্কে। আপনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেন বা বাটন মোবাইল, আপনার কাছে এনআইডি কার্ড থাকুক বা না থাকুক—সব সমস্যার সমাধান পাবেন এখানে।
বিকাশ একাউন্ট খুলতে কী কী লাগে?
শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক একাউন্ট খুলতে আপনার হাতের কাছে কী কী থাকা প্রয়োজন। মূলত তিনটি উপায়ে আপনি একাউন্ট খুলতে পারেন, তবে সবচাইতে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো বিকাশ অ্যাপ।
- স্মার্টফোন এবং একটি সচল সিম কার্ড: (গ্রামীণফোন, রবি, এয়ারটেল, বাংলালিংক বা টেলিটক)।
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): অরিজিনাল কপি থাকতে হবে।
- নিজের চেহারা: অ্যাপে ছবি তোলার জন্য।
১. বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে পার্সোনাল বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
সবচাইতে সহজ পদ্ধতি হলো নিজের স্মার্টফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে একাউন্ট খোলা। এর জন্য আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
- অ্যাপ ডাউনলোড: প্রথমে প্লে-স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে ‘bkash’ অ্যাপটি ডাউনলোড করে নিন।
- লগইন/রেজিস্ট্রেশন: অ্যাপ ওপেন করে ‘লগইন/রেজিস্ট্রেশন’ বাটনে ক্লিক করুন।
- মোবাইল নম্বর ও অপারেটর: আপনার মোবাইল নম্বরটি দিন এবং সিমের অপারেটর (যেমন- গ্রামীণফোন বা রবি) সিলেক্ট করুন।
- ভেরিফিকেশন কোড: আপনার নম্বরে একটি ওটিপি (OTP) বা ভেরিফিকেশন কোড আসবে। এটি অটোমেটিক সেট হয়ে যাবে।
- শর্তাবলি: নিয়ম ও শর্তাবলি পড়ে ‘সম্মতি দিচ্ছি’ বাটনে ক্লিক করুন।
- এনআইডি কার্ডের ছবি: এখন আপনার এনআইডি কার্ডের সামনের অংশ এবং পরের ধাপে পেছনের অংশের পরিষ্কার ছবি তুলুন।
- তথ্য যাচাই: ছবি তোলার পর আপনার সব তথ্য স্ক্রিনে চলে আসবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ‘পরবর্তী’ বাটনে যান।
- চেহারার ছবি বা সেলফি: এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ফোনের সামনের ক্যামেরা দিয়ে নিজের একটি পরিষ্কার ছবি তুলুন। ছবি তোলার সময় কয়েকবার চোখের পলক ফেলুন।
- পিন সেট করা: তথ্য সাবমিট করার পর বিকাশ থেকে একটি কনফার্মেশন এসএমএস আসবে। এরপর আপনাকে ৫ ডিজিটের একটি গোপন পিন সেট করতে হবে।
ব্যাস! আপনার পার্সোনাল বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম এখানেই সম্পন্ন হলো।
২. অ্যাপ ছাড়া বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
অনেকেই জানতে চান অ্যাপ ছাড়া বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম আছে কি না। হ্যাঁ, আছে। আপনার যদি স্মার্টফোন না থাকে বা অ্যাপ ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করেন, তবে আপনি নিকটস্থ বিকাশ এজেন্ট পয়েন্টে যেতে পারেন।
এজেন্ট পয়েন্টে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে একাউন্ট খুলতে শুধু আপনার মোবাইল এবং এনআইডি কার্ডের মূল কপি নিয়ে যান। এজেন্ট তার কাছে থাকা বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে আপনার ছবি ও এনআইডির তথ্য দিয়ে কয়েক মিনিটেই একাউন্ট খুলে দেবেন। এই প্রক্রিয়ায় আপনাকে কোনো ফর্ম পূরণ করতে হবে না।
৩. বাটন মোবাইলে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
আপনার যদি এনড্রয়েড ফোন না থাকে, তবে চিন্তার কিছু নেই। বাটন মোবাইলে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম মূলত এজেন্ট পয়েন্টের উপর নির্ভরশীল। কারণ বাটন মোবাইল দিয়ে আপনি নিজে নিজে ডিজিটাল কেওয়াইসি (e-KYC) পূরণ করতে পারবেন না।
তবে একবার এজেন্ট পয়েন্ট থেকে একাউন্ট খোলা হয়ে গেলে, আপনি *247# ডায়াল করে খুব সহজেই লেনদেন করতে পারবেন। বাটন মোবাইলে পিন সেট করার পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:
- *247# ডায়াল করুন।
- ‘Activate Mobile Menu’ অপশনটি সিলেক্ট করুন।
- ৫ ডিজিটের নতুন পিন দিন।
- পুনরায় একই পিন দিয়ে কনফার্ম করুন।
৪. জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
অনেকের এনআইডি কার্ড নেই কিন্তু বয়স ১৮-এর বেশি, তারা প্রায়ই খোঁজেন জন্ম নিবন্ধন দিয়ে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা ভালো—বর্তমানে বিকাশ অ্যাপ বা সাধারণ এজেন্ট পয়েন্টে জন্ম নিবন্ধন দিয়ে একাউন্ট খোলার সুযোগ নেই।
বিকাশের নিয়ম অনুযায়ী, ডিজিটাল একাউন্ট খুলতে এনআইডি কার্ড বাধ্যতামূলক। তবে আপনার যদি এনআইডি না থাকে এবং আপনি একাউন্ট খুলতে চান, তবে আপনি আপনার বাবা বা মায়ের এনআইডি ব্যবহার করে একটি সিম কার্ডে একাউন্ট খুলতে পারেন। মনে রাখবেন, যার এনআইডি কার্ড ব্যবহার করবেন, ছবি তোলার সময় তাকেই উপস্থিত থাকতে হবে।
৫. পাসপোর্ট দিয়ে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
আপনার যদি এনআইডি কার্ড না থাকে কিন্তু অরিজিনাল পাসপোর্ট থাকে, তবে আপনি বিকাশ একাউন্ট খুলতে পারবেন। তবে এটি অ্যাপ দিয়ে সম্ভব নয়। পাসপোর্ট দিয়ে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম হলো—আপনাকে সরাসরি বিকাশের ‘গ্রাহক সেবা কেন্দ্র’ বা ‘বিকাশ সেন্টারে’ যেতে হবে।
সেখানে আপনার পাসপোর্টের ফটোকপি, এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং আপনার মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত প্রতিনিধি আপনাকে একটি ফর্ম দেবেন এবং আপনার তথ্য যাচাই করে একাউন্ট খুলে দেবেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েও একই পদ্ধতিতে একাউন্ট খোলা সম্ভব।
৬. আইডি কার্ড ছাড়া বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
অনেকেই অনলাইনে সার্চ করেন আইডি কার্ড ছাড়া বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম লিখে। আইডি কার্ড ছাড়া বিকাশ একাউন্ট খোলার জন্য আপনার পাসপোর্ট বা ডেয়াইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। এবং সেটি নিয়ে স্থানীয় ‘বিকাশ সেন্টার’ বা ‘বিকাশ অফিসে’ যেতে হবে। সেখানের দায়িত্বরত কর্মকর্তা আপনাকে একাউন্ট খুলে দিবেন।
৭. একাধিক বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম
আইনগতভাবে, একজন ব্যক্তি একটি এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে শুধুমাত্র একটিই পার্সোনাল বিকাশ একাউন্ট খুলতে পারেন। অর্থাৎ, আপনি চাইলে নিজের এনআইডি দিয়ে দুটি আলাদা নাম্বারে দুটি পার্সোনাল একাউন্ট খুলতে পারবেন না।
তবে একাধিক বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম নিয়ে যারা ভাবছেন, তাদের জন্য সমাধান হলো—আপনি চাইলে অন্য কারো এনআইডি (যেমন- স্ত্রীর বা অন্য ভাই-বোনের) ব্যবহার করে আপনার দ্বিতীয় সিমে একাউন্ট খুলে নিতে পারেন। এছাড়া আপনার যদি ব্যবসা থাকে, তবে আপনি প্রয়োজনীয় ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে একটি ‘মার্চেন্ট একাউন্ট’ খুলতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার পার্সোনাল ও মার্চেন্ট দুটি একাউন্টই সচল থাকবে।
৮. পিন সেট করার সময় সতর্কতাসমূহ
বিকাশ একাউন্ট খোলার পর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পিন (PIN)। পিন সেট করার সময় নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
- কখনো সহজ পিন (যেমন- ১১১২২ বা ১২৩৪৫) দিবেন না।
- আপনার জন্ম সাল বা মোবাইলের শেষ ৫ ডিজিট পিন হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
- সতর্কবাণী: বিকাশের কোনো প্রতিনিধি কখনো আপনার কাছে পিন নম্বর বা ওটিপি জানতে চাইবে না। কেউ ফোন করে পিন চাইলে বুঝবেন সে প্রতারক।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: বিকাশ একাউন্ট খুলতে কত টাকা লাগে?
উত্তর: বিকাশ একাউন্ট খোলা সম্পূর্ণ ফ্রি। এজেন্ট পয়েন্ট বা অ্যাপ কোথাও কোনো টাকা দিতে হয় না।
প্রশ্ন: এনআইডি কার্ড দিয়ে একাউন্ট খোলার কতক্ষণ পর লেনদেন করা যায়?
উত্তর: অ্যাপ দিয়ে একাউন্ট খোলার সাথে সাথেই আপনি লেনদেন শুরু করতে পারেন। তবে পুরোপুরি ভেরিফিকেশন হতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
প্রশ্ন: পাসপোর্ট দিয়ে কি অ্যাপে একাউন্ট খোলা যায়?
উত্তর: না, পাসপোর্ট দিয়ে একাউন্ট খুলতে হলে আপনাকে বিকাশ গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে যেতে হবে।
প্রশ্ন: সিম হারিয়ে গেলে একাউন্ট কি বন্ধ হয়ে যায়?
উত্তর: না, সিম হারিয়ে গেলে দ্রুত কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে একাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয় এবং পরে নতুন সিম তুলে আবার সচল করা যায়।
উপসংহার
আজকের এই আলোচনায় আমরা বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম সম্পর্কে খুঁটিনাটি সব বিষয় জানার চেষ্টা করেছি। আশা করি, এখন আপনি নিজেই নিজের বা পরিবারের সদস্যদের একাউন্ট খুলে দিতে পারবেন। প্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আপনার জীবনকে আরও সহজ করুন।
আর্টিকেলটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না। আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে নিচে কমেন্ট করতে পারেন, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।